সেই বিশ্বকাপ, এই বিশ্বকাপ

0
6

বিশ্বকাপটার যেন ভীষণ মন খারাপ। সময়ের দরজায় ঠকঠক করে নিজের আগমনী ঘোষণা করে চলেছে, ব্যাট-বলের বিশ্বমাতানো লড়াই এই শুরু হলো বলে, কিন্তু সেটির তেমন উন্মাদনা কই! এই বছরখানেক আগেই বিশ্ব ঘুরে যাওয়া তার ‘বড় ভাই’ ফুটবল বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যে ক্রিকেট বিশ্বকাপটার অভিজ্ঞতার কিছুই মিলছে না।

রাশিয়ায় বিশ্বকাপটার স্মৃতি একটু ঝাপসা হয়তো হয়েছে, কিন্তু এখনো পুরোপুরি মিলিয়ে তো যায়নি। পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি এক বছর আগের ফুটবল–উন্মাদনার চিহ্নও। বেশি অনুসন্ধানের দরকার নেই, ঢাকার অলিগলিতে, বাড়ির ছাদে কোথাও না কোথাও এক বছরের রোদে-তাপে ঝড়ে-জলে জ্বলে থাকা কোনো শীর্ণ পতাকা চোখে পড়ারই কথা। আর্জেন্টিনা নয়তো ব্রাজিল, জার্মানি না হলে স্পেন, ফ্রান্স অথবা পর্তুগাল। এই রমজান মাসে দিনের বেলায় পাড়ার চায়ের দোকানগুলোতেই ঘুরে দেখুন, দর্শন মিলবে ‘আবরু রক্ষা’র দায়িত্ব পাওয়া আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকার।

শুধু কি পতাকা! ফুটবল বিশ্বকাপে শুধু দর্শকের ভূমিকায়ও সব সময় এত সরব বাংলাদেশ যে গত বছর বিশ্বকাপের সময় ব্রাজিলের গ্লোবো টিভির তিন সাংবাদিক এসে ঘুরে গিয়েছিলেন বাংলাদেশে। এই দেশটায় নেইমারদের নিয়ে, বিশ্বকাপ নিয়ে উন্মাদনার চিত্র ব্রাজিলে পৌঁছে দেবেন বলে। এই ব্রাজিলের সমর্থনে বাড়াবাড়ি করতে গিয়েই ‘কপাল পুড়েছে’ একজনের। পুরো বাড়িটাকে ব্রাজিলের পতাকার রঙে রাঙিয়েছিলেন, তাতে আলোচনায়ও এসেছিলেন। কিন্তু পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, তাঁর যা বেতন আর যা পৈতৃক সম্পত্তি, তাতে এমন বাড়ি করার সাধ্য হওয়ার কথা নয়। ব্যস, তৎপর দুদক!

এই পতাকা টাঙানো, বাড়ি রাঙানো…ফুটবল বিশ্বকাপের আগমনী গান হয়ে সেসবের দৃশ্যমান হওয়ার শুরু তো হয়েছিল বিশ্বকাপের অনেক আগেই। কোথাও ১৫ দিন, কোথাও বা এক মাস। কিন্তু ক্রিকেট বিশ্বকাপে? ব্যাট-বলের লড়াইটা শুরু হয়ে গেলে হয়তো উন্মাদনা বাড়বে, কিন্তু বিশ্বকাপের ১৫ দিন আগেও ঢাকার রাস্তায় বিশ্বকাপের ছাপ ছিল কই?

অথচ বাংলাদেশে ক্রিকেট বিশ্বকাপেই উন্মাদনাটা বেশি হওয়ার কথা ছিল না? নেইমার-মেসি-রোনালদোরা তো দূর আকাশের তারা, তাঁদের দূর থেকে দেখাই যায় শুধু, তাঁরা আপন নন। কিন্তু ক্রিকেট বিশ্বকাপে তো বাংলাদেশের লাল-সবুজ জার্সিটাই থাকছে। মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ—বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের খুব কাছের এই নামগুলোই আলো ছড়াবে বিশ্বকাপে। আশা অন্তত তা-ই।

চার বছর আগে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে বিশ্বকাপে প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালের স্বাদ পেয়েছে বাংলাদেশ, মাঝের চার বছরে ব্যর্থতার দীর্ঘশ্বাসের চেয়ে সাফল্যের হাসি অনেক বেশি। দ্বিপাক্ষিক সিরিজের বাইরে কখনো কোনো টুর্নামেন্টের ফাইনাল না জেতার একটা আক্ষেপ ছিল, এর আগে ছয়বার ফাইনালে গিয়েও বেশির ভাগ সময়েই মিলেছে ‘ইশ-যদি’র আক্ষেপ। কিন্তু বিশ্বকাপের ঠিক আগে ‘রবার্ট ব্রুস’ বাংলাদেশ, সপ্তমবারের চেষ্টায় সফল! আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজ জিতেছে দল, বিশ্বকাপের প্রত্যাশার পারদ তাতে আরেকটু চড়েছে।

উন্মাদনাও কি একটু বেড়েছে? হয়তো। চায়ের আড্ডায়, ফেসবুকের স্ট্যাটাস-কমেন্টে তা টের পাওয়া যায়। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রতিটি জয়ে আনন্দ মিছিল, হয়তো কাজ ফেলে রেখেও টিএসসি-শাহবাগে বড় স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকা…অন্য সব বারের মতো দৃশ্যগুলোর দেখাও হয়তো মিলবে। তবে এক বছর আগের স্মৃতি জানিয়ে যায়, ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা আর এই উন্মাদনায় কিছুটা ফারাক থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here