ঢাকাই সিনেমার সেকালের সাফল্য একালের ব্যর্থতা

0
7

দেশি ছবির দিকে তাকালে সত্যিকার অর্থেই এখন কান্না পায়। একসময় কী জমজমাটই না ছিল এ দেশের সিনেমা হলগুলো! চিরচেনা চরিত্রের ভিড়ে সামাজিক সেন্টিমেন্টের ছবিগুলো ছিল হাসিকান্নার সিকোয়েন্সে ভরপুর।

দর্শক প্রাণভরে উপভোগ করে তৃপ্তি নিয়ে সিনেমা হল থেকে বেরিয়েছেন। এরপর কয়েকটা দিন ছায়াছবির দৃশ্যগুলো দর্শকের স্মৃতিপটে ভাবনা বিলাসের রিল টেনে যেত। আনমনে দর্শক বারবার সুর ভাজতেন ছবির হৃদয়ছোঁয়া কোনো গানের। কল্পনায় ছবির নায়ক বা জীবনঘনিষ্ঠ কোনো চরিত্রের মাঝে আবিষ্কারের চেষ্টা করতেন নিজেকে।

আর এখন? দেশি চলচ্চিত্রের দৈন্য। হাজারো সিনেমা হলের অস্তিত্ব বিলীন হতে হতে এখন শতকের ঘরে বন্দী। হতাশা এখানেই ঝাপটা মেরে ক্ষান্ত নয়। এসব হল বছরজুড়ে সচল রাখার মতো নতুন ছবির আকাল। জবরদস্ত লগ্নি নেই, এক নামে ঘাঁই মারার মতো পরিচালক নেই, আর নায়ক-নায়িকার আক্রা তো আছেই। এক শাকিব খান বা বুবলীকে নিয়ে আর কদিন?

এখন প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক, দেশি চলচ্চিত্রের এমন ১২টা বাজল কেন? এই মহিরুহের পতনবীজ খোঁজার আগে একপাক ঘুরে আসা যাক আদি উৎস সেই সত্তরের দশকে।

জাদুকরি সত্তর
ওই সময় দেশি ছায়াছবির মধ্যে একটা জাদু ছিল। কাহিনি, নির্মাণশৈলী, অভিনয়, গান এমনকি সিনেমার পোস্টারেও ছিল ছুঁ মন্তর ছুঁ। জেলা বা মফস্বল শহরের জনবহুল মোড়ে নতুন কোনো ছবির পোস্টার লাগালে পথচারীরা গন্তব্যের কথা ভুলে হাঁ করে দাঁড়িয়ে যেতেন।

সত্তরের দশক এ দেশের চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগ। ওই সময় সামাজিক সেন্টিমেন্টের এমন সব দারুণ ছবি নির্মিত হয়েছে, প্রেক্ষাগৃহে ঢুকে সব ধরনের দর্শক ছবিগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখেছেন।

ঢাকাই ছবির যাত্রালগ্ন থেকেই বেশ কিছু ভালো ছবি তৈরি হয়েছিল। এরপর ১৯৭০ সাল বা এর আগে বেশ কিছু ভালো ছবি তৈরি হয়েছে। সব ধরনের দর্শককে একঠায় সিনেমা হলে ধরে রাখার মতো গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতারও অভাব ছিল না। পুরোধা ব্যক্তি আবদুল জব্বার খানের পথ অনুসরণ করে এহতেশাম, মুস্তাফিজ, সুভাষ দত্ত, রহীম নেওয়াজ, নারায়ণ ঘোষ মিতা, এস এম শফি, মোস্তফা মেহমুদ, খান আতাউর রহমান, আজিজুর রহমান, মহসিন, কামাল আহমেদ প্রমুখ বেশ কিছু ভালো ছবি তৈরি করেছেন।

‘এ দেশ তোমার আমার’, ‘হারানো দিন’, ‘চকোরী’, ‘রাজধানীর বুকে’, ‘চান্দা’, ‘কখগঘঙ’, কাঁচের স্বর্গ, ‘নাচের পুতুল’, ‘কাঁচ কাটা হীরে’, ‘সমাধান’, ‘দীপ নেভে নাই’, ‘ছদ্মবেশী’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’, ‘ছন্দ হারিয়ে গেল’, ‘পীচ ঢালা পথ’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘আবির্ভাব’, ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘কত যে মিনতি’, ‘আগন্তুক’, ‘যোগবিয়োগ’, ‘মানুষের মন’, ‘অন্তরঙ্গ’, ‘একই অঙ্গে এত রূপ’, ‘স্মৃতিটুকু থাক’, ‘যাহা বলিব সত্য বলিব’—এমন আরও অনেক ছবির নাম করা যায়।

গুণী নির্মাতা জহির রায়হান তাঁর এক ছবি ‘জীবন থেকে নেয়া’ দিয়েই তো বাজিমাত করলেন। সাধারণভাবে তা পারিবারিক ড্রামা। প্রতীকী ব্যঞ্জনায় এসেছে তৎকালীন পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন। এককথায় ওই সময় জহির রায়হানের এই সাহসী শৈল্পিক ভূমিকা ছিল অসাধারণ!

এ সময় দর্শক মাত করা অনেক ছবি তৈরি হয়েছে। কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ, পরিচালনা সবই ছিল স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে অনন্য। গানগুলোর কথা আর সুর মন ছুঁয়ে যেত। এখানে ‘দর্পচূর্ণ’ ছবির কথা বলা যায়। নিটোল একটা প্রেমের গল্প। কাহিনির বাঁকে বাঁকে ছিল ড্রামা। অভিনয়ে ছিলেন ওই সময়ের অন্যতম সেরা রোমান্টিক জুটি রাজ্জাক-কবরী। ছবিটির সেই যে প্রাণ উতলা করা গান ‘তুমি যে আমার কবিতা…’ এখনো অনেককে আপ্লুত করে। এ ধরনের ছবি ছিল আরও অনেক।

পরিচালকও ছিলেন একেকজন বাঘা বাঘা। যেমন নারায়ণ ঘোষ মিতা। ১৯৬৮ সালে মুক্তি পেল তাঁর ‘এতটুকু আশা’। সে ছবি দেখতে গিয়ে দর্শক কেঁদেকেটে আকুল। বিশেষ করে ‘তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়…’এই গানের দৃশ্যে হাপুসনয়নে কেঁদে বুক ভাসিয়েছেন দর্শক। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁর ‘আলোর মিছিল’ ছবিটিও ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। এ ছবিতে বেশ কিছু শ্রুতিমধুর গান রয়েছে। পরবর্তী সময়ে আরও কিছু দর্শকনন্দিত ছবি আসে তাঁর হাত ধরে।

 

সুজন-সখী’

আর কাজী জহিরের নাম না বললেই নয়। তাঁর প্রতিটা ছবিই অসাধারণ। ছবির কাহিনির বাঁকে বাঁকে চমক, নাটকীয়তা আর গান হলো তাঁর ছবির প্রাণ। ষাটের দশকে যাত্রা শুরু করে সত্তরের পুরো দশকজুড়ে তিনি ডাকসাইটে নির্মাতা হিসেবে ছিলেন। নয়নতারা, ময়নামতি, মধুমিলন—এসব ছবি করে পর্দা কাঁপিয়ে দিলেন। ‘ময়নামতি’ ছবিতে বশীর আহমেদের গাওয়া ‘অনেক সাধের ময়না আমার…’ এবং ‘মধুমিলন’ ছবিতে ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া ‘কথা বলো না বলো ওগো বন্ধু…’ গানগুলো পুরোনো দিনের দর্শক-শ্রোতাকে এখনো আবেগাপ্লুত করে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কাজী জহির বানালেন ‘অবুঝমন’। এই ছবিতে হিন্দু জমিদার কন্যার সঙ্গে মুসলিম ডাক্তারের প্রেম নিয়ে এলেন তিনি। তাঁর শৈল্পিক উপস্থাপন দর্শক লুফে নিল। এ ছবিতে ‘চলার পথে অনেক দেখা…’ গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়। মেলোড্রামায় অভ্যস্ত ঢাকাই ছবির দর্শকদের তিনি দিলেন ভিন্ন রকমের ট্র্যাজেডির স্বাদ। তাঁর আরেকটি সুপারহিট ট্র্যাজেডি ছবি ‘বধূবিদায়’।

খান আতা কি কম? শবনম-রহমান অভিনীত তাঁর রোমান্টিক ছবি ‘জোয়ার ভাটা’ ওই সময়ের অন্যতম সেরা ছবি। গানগুলো অসম্ভব মিষ্টি। ‘একটি ছিল কুহু কুহু কোকিলা যারে ডাকে…’। খান আতা নিজেও এ ছবিতে বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ওই সময় দিগ্ভ্রান্ত যুবকদের কাহিনি বানালেন ‘আবার তোরা মানুষ হ’। এ ছবিতেও শ্রুতিপ্রিয় একাধিক গান রয়েছে। রয়েছে একটি প্রধান চরিত্রে খান আতার অসাধারণ অভিনয়।

ওই সময় অবশ্য মুক্তিযুদ্ধে পটভূমিতে বেশ কিছু ছবি নির্মিত হয়। এগুলো মোটামুটি সবই প্রশংসিত হয়েছে। দর্শক টেনেছে। এর মথ্যে ‘ওরা ১১ জন’, ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘আমার জন্মভূমি’, ‘ধীরে বহে মেঘনা’—ছবি বেশি আলোচিত হয়। এসব ছবির মধ্যে মিতার ‘আলোর মিছিল’, হারুনর রশীদের ‘মেঘের অনেক রং’, খান আতার ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ছিল একেবারেই অন্য রকম।

একের ভেতর অনেক গুণ ছিল খান আতার। তিনি যে কেবল সুনিপুণ পরিচালকই নন, শক্তিমান অভিনেতা, গুণী সংগীত পরিচালক, ভালো চিত্রনাট্যকার, কাহিনিকার ও সংলাপ রচয়িতা ছিলেন। রহীম নেওয়াজ পরিচালিত ‘মনের মতো বউ’ ছবিতে অভিনয় আর সুরকার হিসেবে ওই সময়ের অগণিত দর্শক-শ্রোতাকে মাত করেছেন তিনি। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া তাঁর ‘সুজনসখী’ ছবিটি গুণেমানে যেমন প্রশংসা অর্জন করে, তেমনি আয়ও করে প্রচুর। এ ছবির গানগুলোর মধ্যে ‘সব সখীরে পার করিতে নেব আনা আনা…’ ওই সময়ের অন্যতম সুপারহিট খান।

এমন আরেকজন চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন জহিরুল হক। তিনিও ভালো কাহিনি লিখতেন। সংলাপ-চিত্রনাট্যে ছিলেন কুশলী। ভালো অভিনয় করতেন। বাংলাদেশে তাঁর হাতেই প্রথম নির্মিত হলো পরিপূর্ণ অ্যাকশন ছবি ‘রংবাজ’। ঢিসুম-ঢিসুম মারপিটে রাজা গুন্ডার ভিন্ন ইমেজে এসে সারা দেশের দর্শকদের অন্য রকম বিনোদন দিলেন নায়করাজ রাজ্জাক। এ ছবির জন্য মফস্বলের হলগুলোতে অগ্রিম টিকিটও বিক্রি হয়েছে। এরপর ‘অবাক পৃথিবী’. ‘টাকার খেলা’, ‘অপরাধ’. ‘আপনজন’. ‘সাধু শয়তান’, ‘রাতের পর দিন’, ‘বাদশা’, ‘অন্তরালে’, ‘জীবন নিয়ে জুয়া’, ‘সমাধি’, ‘গুণ্ডা’, ‘আসামি’—এমন আরও অনেক অ্যাকশন ছবি নির্মিত হয়েছে। প্রতিটি ছবিই ছিল ব্যাপক ব্যবসা সফল।

এসব ছবির আগমনে ঢাকাই ছবির দর্শকদেরও রুচির বদল ঘটে। একপর্যায়ে দেখা গেল, নিটোল সামাজিক ছবি সেভাবে আর মন ভরাতে পারছে না দর্শকদের। ছবিতে ঢিসুম-ঢিসুম অ্যাকশন, কোমর দোলানো নাচ, চটুল গান আর কৌতুকাভিনেতাদের দু-চারটা হাসির দৃশ্য না থাকলেই নয়।

এ সময় ভদ্রঘরের মার্জিত রুচির দর্শক সিনেমা হল থেকে মুখ ফেরাতে শুরু করেন। শিল্পের প্রতি নিবেদিত নিখাদ মৌলিক কাহিনির চলচ্চিত্র নির্মাতারাও থমকে যান। নতুন ধরনের নির্মাতাদের আবির্ভাব ঘটতে থাকে। দর্শকের মূল সারি থেকে শিক্ষিত সমাজ সরে যেতে থাকে।

কিছুদিন পর দেখা যায়, দর্শক নায়িকার হাসিকান্নার অভিব্যক্তির চেয়ে বরং তার কোমর দোলানো নাচটাকেই বেশি পছন্দ করছে। আর নায়কের বেলায়ও দর্শকের রুচি যায় বদলে। নায়ক কেন এই ধরার মাটির মানুষ হবেন? তিনি হবেন ‘সুপারম্যান’। নায়ক যদি একাই দশ-বারোজনকে মেরে তক্তা বানাতে না পারেন, তবে আর তিনি কিসের ‘হিরো’?

ষাট বা সত্তরের দশকে ছায়াছবির ভিলেনদের ভাবমূর্তি তেমন জুতের ছিল না। ওই সময় জাভেদ রহিম, রাজু আহমেদ, মিঠু, জুবের আলম, রাজ, মতিন, দারাশিকো, বাবর প্রমুখ অভিনেতা ঢাকাই ছবির শীর্ষস্থানীয় ভিলেন ছিলেন। কারও কারও তো এমন ইমেজ ছিল, পর্দায় এলে অনেক দর্শক আঁতকে উঠতেন। বিশেষ করে নারী দর্শক। তবে তাঁরা জনপ্রিয়তায় কখনোই নায়কদের সমকক্ষ ছিলেন না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here